বিষম তারার গল্প

নক্ষত্র
কসমোলজি
বিষম তারার খুব ভাল একটি উদাহরণ লোহিত অতিদানব তারা বিটলজুস। বাংলা নাম আর্দ্রা। কালপুরুষ বা আদমসুরত মণ্ডলের দ্বিতীয় উজ্জ্বল তারা। রাতের আকাশের আপাত উজ্জ্বলতায় ক্রমিক নং ১০। ২০১৯ সালে এটি দ্রুত অনুজ্জ্বল হতে থাকে। ২০২০ নাগাদ আগের অর্ধেক উজ্জ্বল হয়ে যায়। এ আকস্মিক পরিবর্তন অনেকসময় সুপারনোভা হিসেবে বিস্ফোরিত হওয়ার লক্ষ্মণ প্রকাশ করে।

তারা মানেই উজ্জ্বল। এমনকি মৃত তারাও জ্বলে বহুদিন। কেউ বেশি উজ্জ্বল। কেউ কম। কেউ আবার একইসাথে কম ও বেশি। ভুল বললাম। একইসাথে না। সময়ের সাথে সাথে ওঠানামা করে উজ্জ্বলতা। এরাই ভ্যারিয়েবল বা বিষম তারা।

সৌরজগতের নক্ষত্র সূর্য। সূর্যেরও কিন্তু উজ্জ্বলতার পরিবর্তন হয়। তবে সূর্যকে বিষম তারা বলে না। ১১ বছরের চক্রে সূর্যের উজ্জ্বলতা ১% পরিবর্তন হয়। এটুকু পরিবর্তনের জন্য তারাকে বিষম বলে না। এমনিতে এদের সংখ্যা লক্ষ লক্ষ। নোভা বা সুপারনোভা নক্ষত্র হঠাৎ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। স্থায়িত্ব হয় মাত্র কয়েক সপ্তাহ থেকে কয়েক মাস। আর বিষম তারা বারবার উজ্জ্বল-অনুজ্জ্বল চক্রে চলতে থাকে।

বিটলজুস যেকোনো সময় সুপারনোভা হয়ে যাবে।

বিষম তারার খুব ভাল একটি উদাহরণ লোহিত অতিদানব তারা বিটলজুস। বাংলা নাম আর্দ্রা। কালপুরুষ বা আদমসুরত মণ্ডলের দ্বিতীয় উজ্জ্বল তারা। রাতের আকাশের আপাত উজ্জ্বলতায় ক্রমিক নং ১০। ২০১৯ সালে এটি দ্রুত অনুজ্জ্বল হতে থাকে। ২০২০ নাগাদ আগের অর্ধেক উজ্জ্বল হয়ে যায়। এ আকস্মিক পরিবর্তন অনেকসময় সুপারনোভা হিসেবে বিস্ফোরিত হওয়ার লক্ষ্মণ প্রকাশ করে। তবে বিটলজুস বিস্ফোরিত হয়নি। পরে আবার স্বাভাবিক উজ্জ্বলতায় ফিরে আসে। এর আপাত উজ্জ্বলতার মান ০ থেকে ১.৬ হতে পারে। বেশি উজ্জ্বল তারার ক্ষেত্রে এই মানটি হয় ছোট।

বিষম তারার আছে আবার নানান রকমফের। অন্তর্নিহিত বিষম তারার উজ্জ্বলতা পরিবর্তন হয় নিজস্ব অভ্যন্তরীণ কারণে। এদের সবচেয়ে ভাল উদাহরণ হলো সিফিড বিষম তারা (Cepheid)। এদের আরেকটি পরিচয়, এরা স্পন্দনশীল তারা। এদের অভ্যন্তরে সংঘটিত বিবর্তন প্রক্রিয়ার কারণে ব্যাসার্ধ পালাক্রমে বড়-ছোট হয়। আর তাতেই উজ্জ্বলতার তারতম্য ঘটে। সিফিড নামটা এ ধরনের আবিষ্কৃত প্রথম তারা ডেল্টা সিফিয়াই থেকে। ১৮৭৪ সালের এটি আবিষ্কৃত হয়।

আরেক ধরনের বিষম তারার উদ্ভব ঘটে নোভা নক্ষত্র থেকে। ল্যাটিন শব্দ নোভা মানে নতুন তারা। এক্ষেত্রে কোনো শ্বেত বামন তারা পাশ্ববর্তী কোনো তারা থেকে জ্বালানি নিয়ে নতুন করে ফিউশন শুরু করে। উজ্জ্বল হয়ে ওঠে তারাটা। জ্বালানি ফুরোলে আবার অনুজ্জ্বল। অনেক বেশি সংগ্রহ করতে পারলে শ্বেত বামনরা সুপারনোভা বিস্ফোরণও ঘটাতে পারে। এ ধরনের সুপারনোভকে বলে টাইপ ওয়ানএ সুপারনোভা (Type Ia supernov)। অন্তর্নিহিত বিষম তারাদের মধ্যেই আবার বহু রকমফের আছে। এই যেমন আরআর লাইরি, মাইরা বা দীর্ঘ-পর্যায়কালের বিষম তারা। এদের সবারই উজ্জ্বলতায় পরিবর্তন ঘটে অভ্যন্তরীণ কারণে।

বাহ্যিক বিষম তারার উজ্জ্বলতার পরিবর্তন হয় বহিস্থ কোনো কারণে। এরাও আছে নানান রকম। তবে এদের সবাইকে মোটামুটি দুইভাগে ভাগ করা যায়। গ্রহণশীল জোড়াতারা ও আবর্তনশীল বিষম তারা। গ্রহণশীল বিষম তারারা জোড়ায় জোড়ায় থাকে। উজ্জ্বলতার পরিবর্তনের প্রক্রিয়ার সাথে মিল আছে সূর্যগ্রহণের। জোড়াতারারা একে অপরকে কেন্দ্র করে ঘোরে। ফলে পৃথিবী থেকে দেখতে কখনো কখনো একটি তারা চলে আসে আরেক তারার সামনে। ফলে পেছনের তারার উজ্জ্বলতা ঢাকা পড়ে যায়। এ ধরনের বিখ্যাত এক তারার নাম অ্যালগল। অবস্থান পারসিয়াস তারামণ্ডলে। ৩২০০ বছর আগে মিশরীয়রা তারাটার উজ্জ্বলতার পরিবর্তন লক্ষ করেছিল। এ নামে আমরা আমরা যে তারা দেখি, সেটি আসলে তিন তারার এক জগত। উজ্জ্বলতার মান সর্বোচ্চ ২.১ থেকে কমে ৩.৪ পর্যন্ত নেমে যেতে পারে (মান বেশি মানে কম উজ্জ্বল)।

নাম থেকেই বোঝা যায়, আবর্তনশীল বিষম তারার উজ্জ্বলতা পাল্টে ঘূর্ণনের কারণে। এদের মধ্যেও আছে নানা ধরন। কারও কারও পৃষ্ঠে আছে বিশাল আকারের সৌরদাগ। যারা নক্ষত্র থেকে আসা আলোকে বাধাগ্রস্ত করে। আবার বিষম আকৃতির কারণে অনুজ্জ্বল অংশ দৃষ্টির সামনে এলেও উজ্জ্বলতা কম দেখাতে পারে। কন্যামণ্ডলের তারা চিত্রা এমন এক তারা। উজ্জ্বলতার মান ০.৯৭ থেকে ১.০৪ হতে পারে।

জ্যোতির্বিজ্ঞান গবেষণায় বিষম তারা খুব ভাল ভূমিকা রাখে। নক্ষত্রের বৈশিষ্ট্য, ইতিহাস ও ভবিষ্যৎ জানতে এরা সহায়তা করে। চাইলে আপনিও বিষম তারা পর্যবেক্ষণ করতে পারেন। হয়ে যেতে পারেন তারা খোঁজাখুঁজির অংশ । অ্যামেরিকান অ্যাসোসিয়েশন অন্য ভ্যারিয়েবল সটার অবজারভারস (এএভিএসও) এক্ষেত্রে আপনার বন্ধু হিসেবে কাজ করবে। www.aavso.org ওয়েবসাইট ব্রাউজ করে জানা যাবে বিস্তারিত। বিজ্ঞান চর্চায় যে সবসময় দামী দামী যন্ত্র লাগে না তারও এক প্রমাণ বিষম তারা। এসব তারা নিয়ে গবেষণা করতে শুধুই প্রয়োজন খালি চোখ আর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ। তো, আজ থেকেই হয়ে ওঠুন জ্যোতির্বিদ!

{{< include ../_related.qmd >}}